মোটরসাইকেলে চট্টগ্রাম থেকে তেতুলিয়া -Part 1

এইমাত্র গোসল করলাম।এই প্রচন্ড শীতে কাঁপুনি আসতে পারে ভেবে ইতিমধ্যেই পুলোভার,জ্যাকেট,মাফলার গায়ে চড়িয়ে এক কাপ গরম চা নিয়ে বসেছি।কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে,কি লিখব বুঝতে পারছিনা,তবে মনে হচ্ছে উত্তরবংগের শীতের অনুভূতি…হাহাহাহা…শীত কিভাবে আসলেই কাঁপুনি তোলে এবার ওখানে যাওয়ার পথে টের পেয়েছি।তাহলে এভাবেই শুরু করি…হাহহাহা…

বিসমিল্লায় গলদ, ২২শে ডিসেম্বর,২০১৪:

যথারীতি আমার পেঁচীর কাছ থেকে ছুটতে দেরী হয়ে গেল,খেয়ালই করিনি দেরী হয়ে যাচ্ছে।পরে তাড়াহুড়ো করে,ব্যাগ গুছিয়ে,রেডি হয়ে বের হতে হতে এক ঘন্টা দেরী করে ফেললাম।ভোর ৫টায় রওনা দেবার কথা সেখানে বেজে গেল ৬টা।আমার দোস্ত কাউয়া ক্ষেপে তারস্বরে পিছনে বসে বসে চিৎকার করছে।“আমার কান্ডজ্ঞান নাই।আজকে কিভাবে আমি দেরী করি।তার উপর তারে এক ঘন্টা আমি ঠান্ডা দিয়া বাহিরে দাড় করাইয়া রাখছি।আমি পুরাই ****…”।আসল কথা তো আর বলতে পারি না,তাই চুপ থাকাই শ্রেয় ভেবে নিলাম।

যাই হোক,বকা খেয়ে হোটেলে ঢুকে পড়লাম নাস্তা খেতে।নাস্তা খেয়ে বের হয়ে রওনা দিতে না দিতেই পুলিশ আমাদের দাড় করাল।মামুরা পুরাই ত্যাঁদড়,কিছুতেই আমাদের ছাড়বে না।শেষ-মেষ মামুদের উপরি দিয়া রওনা যখন দিলাম আবার তখন ৮টা বেজে গেছে।হাহাহা…আমরা দুই বন্ধু কতক্ষণ হাসি,কতক্ষণ মামুদের গাইল্লাই।এই করে করেই দুপুর ১টা ৩০মিনিটের দিকে পৌছে গেলাম হরিণাঘাটা।পথে দু’বার চা খাবার বিরতি নিলাম।একবার মিররসরাইয়ের কাছে,আরেকবার ফেনির কাছে কোথাও।ছবি তুলতে দাড়িয়েছিলাম লক্ষীপুর শহীদমিনারের সামনে,নারকেলের বাজারে,রায়পুর মেইন রোডে।

dsc08410

ভাগ্য ফাইনালী ভালর দিকে গেল,আমরা ঠিক ফেরী ছাড়ার আগ মুহুর্তে পৌছে ছিলাম ফেরিঘাটে।আমরাও উঠলাম ফেরীও ছেড়ে দিল।ফেরিতে বাইক,ব্যাগ,আমাদের অবস্থা দেখে সাতক্ষীরার একজন ট্রাক ড্রাইভার আমাদের ডেকে ট্রাকের ভেতর বসে বিশ্রাম নিতে বললেন।কারণ ফেরী পার হতে লাগবে দেড় ঘন্টা।দেরী না করে লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম ট্রাকে।শুরু হয়ে গেল গল্প আর বিড়ি…যদিও আমার দোস্তই দু’জনের পক্ষ হয়ে একাই কথা চালিয়ে গেল,আমি কেবলই হু,হ্যাঁ-তেই সীমাবদ্ধ।কারণ আমার ধান্দা হচ্ছে ঘুমানো।যাই হোক,হালাদের বকবকানি ঘুম কেন,ঘুমের ছায়ারও দেখা পেলাম না।হঠাৎই দেখলাম আমরা পৌছে গেছি।ফারুক ভাই ও বেশ অবাক হয়ে গেলেন,এত দ্রূত এসে পড়লাম কিভাবে।ফারুক ভাই হচ্ছেন সাতক্ষীরার সেই ট্রাক ড্রাইভার।কি আর করা,নেমে পড়লাম ট্রাক থেকে। ছবি তুললাম,সময় নাই।

ফেরী থেকে নেমে ঘাটেই লাঞ্চ করে নিলাম। পোয়া মাছ আর ভাত…এমন পোয়া মাছ চট্টগ্রামেও খাই নাই,হাহাহা…ক্ষুধা হচ্ছে বেস্ট সস,তাই না?যাই হোক,খেয়ে রওনা দিতে বাইক স্টার্ট দিব,এমন সময় দুই পিচ্চি এসে জিজ্ঞেস করল, “ভাইয়া এটা কি জাম্পিং বাইক”?হাহাহাহাহা…ভালই মজা পাইলাম,লেটস গো,জাম্পিং বাইক…হাহাহা…

যে রাস্তা ধরে আমরা জাম্পিং করছি রাস্তাটা এতই সরু যে একটা ট্রাককে পাস করার মত জায়গা নাই একটা বাইকের।একটা মোড় নেয়ার সময় ট্রাককে টু পয়েন্টার টার্ণ নিতে হয়,আজিব এক রোড।তবে বাইকের জন্য অসাম একটা রোড।বিপরীত দিক থেকে বড় কোন গাড়িই আসতে দেখিনি,মনে হয় কোন বাইপাস টাইপ রোড ছিল।যা কেবল স্পেশাল ফেরিতে করে আসা মাছের ট্রাক ব্যবহার করে বলে একদিক থেকেই বড়গাড়ি চলে কেবল।যাই হোক,একবার ট্রাক দাঁড়িয়ে সাইড দিয়ে দিলে বাকি রাস্তাটা যে কোণ বাইকারের জন্য অসাম।।মোটের উপর,দ্রুতই পার করে ফেলা সম্ভব।

ফাইনালী,আমাদের জাম্পিং বাইক যেখানে ল্যান্ড করল সেটা আরেকটা ছোট ফেরিঘাট।বিশাল গাড়ির লাইন ছিল,বাট নো ওরিস,আফটার অল,জাম্পিং বাইক।চিপাচাপা দিয়া গিয়া একদম লাইনের মাথায় গিয়া দাড়ালাম।ফেরি থেকে গাড়ি নামলেই উঠে যাব।সাথে আরো স্থানীয়া দুই/তিনটা বাইক দাঁড়ানো।আমাকে একজন ডেকে বললেন যে বাইকটা একটু সরিয়ে দাড়ানোর জন্য,ফেরি থেকে না হলে গাড়ি নামতে ঝামেলা হবে।এখন সরে যেখানে দাড়ালাম,তার কারণে আর ওনাদের কারো বের হবার কোন জায়গা থাকল না।বের হতে হলে আমাকে আগে যেতেই দিতে হবে।হাহাহাহা…তবে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম গাড়ি সব নেমে গেল কিন্তু ফেরীতে আমাদের উঠতে দিচ্ছে না।এমন সময় একজন বাইক স্টার্ট দিলেন এসে,বললেন ফেরীরে ট্রলার লাগছে,ইশারাতে ওদিকে যেতে বললেন।আমি তো বেকুব হয়ে তাকিয়ে রইলাম।পাশের একজন বাইকার বুঝিয়ে বললেন,আমিও খুশি মনে ফেরীতে উঠে পড়লাম আর সোজা গিয়া ঝাপ দিয়ে নেমে পড়লাম নদীতে…তবে নদীর উপরে একটা ট্রলাম ভাসছিল।হাহাহাহা…আসল কথা হল,গিয়া তো পুরাই অবাক হয়ে গেলাম।আরে মর জ্বালা,এটাতে উঠামু কেমনে বাইক।ফেরীর সাইড গার্ডেইতো বাইক আটকে আছে,জোরে আইসা ফাল দিলে তো ট্রলার দৌড় দিব,আর আমি তখন রিয়েলি নদীতে যামু।এদিক ওদিক চাইতাছি,সবাই তামশা দেখতাছে ফ্রিতে।এমন সময় ট্রলারের মাঝি হাত তুলে দাঁড়াতে বলল।সামনে এসে দাঁড়াতে ইশারা করলেন।দাড়াবার পরে,হাত দিয়ে টেনে বাইকের সামনের চাকা গার্ড বার পার করে ট্রলারে উঠিয়ে দিলেন,বাকিটা তামশা ছাড়াই উঠে গেলাম।ব্যাস,শেষ পর্যন্ত ট্রলারে করেই পার হলাম কোন খাল বা কোন নদী।ঘড়িতে তখন ৪টা ৩০মিনিট আর আমরা মাদারীপুরের পথে।

এই রাস্তাটার খুবই খারাপ অবস্থা।কাজ চলছে, পুরাই গ্রেভেল রোড যাকে বলে আরকি।এতই লুজ সারফেস যে ৩০ এর উপরে চালাতে রিতীমত কষ্ট হচ্ছিল,বাইক প্রতিবাদ করে ওঠে জাম্প দিতে…হাহাহাহা…ওখানে এক বয়স্ক মানুষকে জিজ্ঞেস করলাম এখানে থেকে কুষ্টিয়া যেতে কিরকম সময় লাগবে।কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন কাল সকাল হয়ে যাবে।আমরা কি কমু বুঝতে পারলাম না,কেবল আমি দোস্তর দিকে তাকাই,দোস্ত আমার দিকে তাকায়।যাই হোক,মুখ চাওয়া-চাওয়ি শেষ করে,প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে দাঁড়িয়ে পড়লাম,আর দু’জনে হিসাব নিকাশ করে সীদ্ধান্ত নিলাম,বুইড়া হালা বেকুব।উল্টা-পাল্টা কইতাছে,বয়সে সম্মানিত মুরুব্বী হালার মাথা পুরাই গেছে।হয়ত মনে করছে আমরা ইন্ডিয়ার কথা কইছি…হাহাহাহা…

যাই হোক,তবে একটা কথা ঠিক বলেছিলেন যে এই রকম রাস্তা আর বেশি দূর নাই।সামনের বাজার থেকেই রাস্তা ঠিক হয়ে গেল আর আমরাও বাতাস কেটে দ্রুত ছুটলাম গন্তব্য কুষ্টিয়া।

img_20141222_165530

সন্ধ্যা ৭টা ১৫মিনিট।

প্ল্যান ছিল এই সময়ের মধ্যে কুষ্টিয়া পৌছে যাবার কিন্তু এখন পেট্রোল পাম্প এ।আগের রাতে ১১০০টাকার তেল নিয়েছিলাম,এখান থেকে নিলাম ১০০০টাকার।বের হয়ে দাড়ালাম এক চায়ের দোকানে।চা খেলাম আর পথের হদিস নিয়ে নিলাম।জেনে নিলাম পথে কোন ডাকাতি বা এই ধরনের কোন সমস্যা আছে কিনা।ওনারা জানালেন আমাদের ভয় নাই,আমরা অনেক আগেই পার হয়ে যাব অই রাস্তাটুকু।খুব রাত হলে গিয়ে যত ভয়,এখন কোন সমস্যা না।যাই হোক চা খেয়ে আর দেরী করলাম না,দিলাম দৌড়।তবে যে জায়গা দাড়িয়েছিলাম সেটার নাম মনে নেই এখন আর,আজিব।হাহাহা…

তখন বাজে রাতের ৯টা বা সাড়ে ৯টা…

ভ্রমণের আসল মজা শুরু।রাস্তা হঠাৎই প্রচন্ড কুয়াশায় ঢেকে গেল।যদিও আমি জ্যাকেট,মাফলার গ্লাভস পরে আছি আমার হাত প্রায় অবশ হবার অবস্থা।তার উপর সমানে বাইক কাপতেছে কারণ আমার দোস্ত পেছনে বসে ঠান্ডায় তার পা কাপতেছে এবং এতই কাপতেছে যে পুরা বাইক ভাইব্রেট করতেছে।আমার ভয় লাগল,হালার আবার হাইপোথারমিয়া হয়ে যায় কিনা।তার কথা মত এক বাজারে বন্ধ দোকানের সামনে দাড়ালাম,যদিও কোন দোকানপাটই খোলা ছিল না আর সেখানে।দোকানের সামনেই ব্যাগ থেকে এক্সট্রা ট্র্যাক বের করে জিন্সের প্যান্টের উপর দিয়ে পরে নিলাম।আমি পুলওভার,হুডি দেন জ্যাকেট,গ্লাভসের ভেতর একটা ইনার গ্লাভস পরে নিলাম।হুডি তুলে,নাক-মুখে মাফলার পেচালাম,তার উপর উইন্টার বাইক মাস্ক পরলাম,দেন হেলমেট পরে আবার রওনা দেবার জন্য রেডি হলাম।এমন সময় যদি এখন প্রকৃতি ডাকে তাহলে কি করব ভেবে দু’জনে খুব হাসাহাসি করে নিয়ে যাত্রা করলাম আবারো।

কুয়াশা ঠেলে এগোচ্ছি।খুবই ভাল রাস্তা।আমাদের চোখে সমগ্র বাংলাদেশের ভেতর বেস্ট রাস্টা হচ্ছে উত্তরবঙ্গে।এত কুয়াশা,দূরের গাড়ির লাইট দেখেই কেবল বোঝা যায় গাড়ি আসছে,রাস্তা দেখার সময় নাই অথচ বাইক নিশ্চিন্তে ৮০-৮৫তে চালাতে পারবেন।একটু ঝাঁকিও লাগবে না।তবে এর চেয়ে দ্রুত গতিতে যেতে পারবেন যদি বাতাসকে ভয় পেতে না হয় আপনার,ভয় পেতে না হয় শীতকে।হাহাহাহা…

ফাইনালী রাতের ১২টা বা শোয়া ১২টার দিকে আমরা পৌছে গেলাম কুষ্টিয়া।

img_20141222_191505

পৌছেই হোটেল খোজা শুরু করলাম।খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি হোটেল খুঁজে পেতে।হোটেলের নাম ছিল হলিডে ইন্টারন্যাশনাল।এত রাতে খোলা পেয়েই আমরা খুশি হলাম।ভাল হোটেলের সাথে মিলিয়ে লাভ নাই,তবে পরিচ্ছন্ন হোটেল।আমরা এটাকে পয়েন্ট জিরো ফাইভ স্টার হোটেল বলে নির্ধারণ করলাম।দেরী না করে রুম থেকে বের হয়ে খেতে নেমে গেলাম।দুটা হোটেল বিসমিল্লাহ আর ???রেস্টুরেন্ট…কিছু একটা…নাম মনে নাই…হাহাহা…মনে হয় যেটার নাম মনে নাই ওটাতেই ঢুকলাম।খেলাম নান,বিফ…দেন রসমালাই…

রসমালাই খেয়ে মনে হল,কুমিল্লারটাকে হার মানায়।

আর নান রুটি তৈরী করার অভিনব এক পদ্ধতি দেখে শিখলাম।যেখানে তন্দুর ব্যবহার করা হয় না,সাধারণ গ্যাসের চুলাতে তৈরী হচ্ছে নানরুটি…তাওয়ার মত একটা কিছুতে শেকা হচ্ছে,পরে উল্টো করে সরাসরি আগুনের ওপর ধরে নানকে পারফেক্ট সফটনেস দেয়া হচ্ছে…আসছে সেই একই রকম ফ্লেভার…তবে হয়ত তা পুরোপুরি নানরুটির কাইয়ের উপর নির্ভর করছে…হাহাহাহা…অ-সা-ম…

খাওয়া দাওয়া শেষ করে আরেক নতুন চমক দেখলাম চা খেতে গিয়া।এটা না কাল সকালেই ভাল করে দেখে বলব…এখন এতই ক্লান্ত যে শরীর কেবলই ঝিমাচ্ছে।তাই চা খেয়েই আর দেরী না করে সোজা রুমে, পয়েন্ট জিরো ফাইভ স্টার হোটেলের বিছানাতেও দু’চোখ ভেঙ্গে ঘুম চলে আসলো,রাজ্যের ঘুম…zzzZZZZ

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s