মোটরসাইকেলে চট্টগ্রাম থেকে তেতুলিয়া -Part 2

নিদ্রা দেবীর প্রেম, ২৩শে ডিসেম্বর ২০১৪:

দেরীতে হলেও উঠলাম,ঘড়িতে তখন ১২টার মত বাজে।কোনদিক দিয়ে সময় গেছে জানি না…হাহাহাহা…ঘুমে আর মরণে সমান ভেবে নিয়ে,দুই দোস্ত তড়িঘড়ি করে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলাম খেতে।গিয়ে দেখি হোটেলে নাস্তা বলতে যে সকল জিনিস যেমন-রুটি বা পরটা কিছুই নাই।যা আছে তা হচ্ছে পুরি,মোগলাই,সিংগারা ইত্যাদি।

কি আর করা,ক্ষুধায় তো পেট জ্বলছে,তাই পুরি দিতে বললাম। পুরি আসলো আর অবাক হবার শুরু হলো।পুরির উপর গুড়া গুড়া যেই জিনিসটা ছড়িয়ে দেয়া আছে, তার বর্ণ লাল আর তার নাম হচ্ছে মরিচ।আমরা পুরাই থ,এটা কেমন?সাথে আবার সস টাইপ একটা জিনিস দিছে আলাদা বাটিতে।তবে যেই পুরির একটা টুকরা সসে ভিজিয়ে মুখে দেবেন আরও অবাক হবেন।এত স্বাদ কোথা থেকে আসল?হাহাহা… সসটা আসলেই পুরাই অন্যরকম,অ-সা-ম…একটু মিষ্টি তবে পুরিতে মরিচের গুড়া থাকাতে তেমন মিষ্টি লাগে না,হালকা ঝাল যুক্ত স্বাদ লাগে।মোটের উপর অসাধারণ…পুরা ৬টা পুরি (যেটাকে ৪টুকরা করে কেটে দেয়া হয়) সাবড়ে দিলাম আর পরে একটা মোগলাই দিতে বললাম…অবশ্য হাফ খেয়ে রণে ক্ষান্ত দিলাম।দোস্তও খাবে না,সে রসমালাই খাবে।হাহাহাহা…কি আর করা একবাটি রসমালাই ও খেয়ে নিলাম…খেয়ে চা খেতে বের হলাম। দুধ চা…বলবেন এটা আবার আলাদা করে বলার কি আছে?

এখানে দুধ চা বেশ অদ্ভূতভাবে তৈরী হয়।চুলায় কেবল পানি গরম হচ্ছে,কোন লীকার না…এখন একটা ছোট ছাকনি টাইপ কৌটা আছে,যেখানে কাচা পাতা দেয়া হয় প্রতিটি কাপ চা বানাবার জন্য।চায়ের পাতাগুলো মিহি করে গুড়া করা।ফলে চা কড়া পাতলা ক্রেতাদের ইচ্ছানুযায়ী করা সম্ভব হচ্ছে কোন ঝামেলা ছাড়াই আর চা-ও খেতে বেশ সুস্বাদু…দুই কাপ খেয়ে ফেললাম কোন কথা ছাড়াই…হাহাহাহা…

সব খানাদানা শেষ করে রুমে ফিরলাম তখন একটা বা দেড়টা বাজে।গোসল সেরে,রেডি হয়ে বের হলাম।উদ্দেশ্য লালনের আখড়া,কুঠিবাড়ি…

img_20141223_141957

লালনের আখড়াঃ একে ওকে জিজ্ঞেস করে পৌছে গেলাম লালনের আখড়ায়।গিয়েই মনটা ভালো হয়ে গেল।অনেক দিন যাবার ইচ্ছা ছিল কিন্তু হচ্ছিল না।যাই হোক,ঘুরে ঘুরে দোকান কি আছে দেখলাম,ছবি তুললাম,মডেলিং করলাম…হাহাহাহা…হাজারটা জিনিস পরে ছবি তুললাম…হাহাহাহা…

পাগলামী শেষ করে মাজারের দিকে গেলাম।ভেতরে দেখলাম লালনের সময়কার চর্চা এখনো ধরে রাখা হয়েছে।গোল হয়ে বসে কে কিভাবে কি অনুধাবণ করছেন তার আলাপ চলছে,তবে সেখানে দাড়ালাম না।ছবি তুলতে ব্যস্ত।এদিকে দোস্ত জিজ্ঞেস করল গান শুনবো কিনা,আবার জিগস বলে রাজি হয়ে গেলাম।সো,গান শুনলাম কিছুক্ষণ লাইভ…ভিডিও করলাম,ছবি তুললাম।এরপর কিছুক্ষণ সাইজি ও তার দর্শন নিয়ে নানা কথা হলো,এপার বাংলা ওপার বাংলার লালনগীতি নিয়ে কথা হল।কথা হল ওনাদের জীবিকা নিয়ে,কিভাবে চলছে সব।লালন সংগীত একাডেমি থেকে তখন গানের সুর ভেসে আসছিল। “আপনারে আপনি চিনি নে…”…হাহাহাহাহা…

সব শেষ করে বের হলাম,যাব কুঠিবাড়ি…

img_20141223_162945

 

কুঠিবাড়ি নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই,কুষ্টিয়া থেকে ১৫ কিঃমিঃ দুরত্বে,মেইন রোড় থেকে বামের দিকে রাস্তা ঢুকেছে একটু গিয়েই ডান দিকে বেঁকে সোজা চলে গেছে কুঠিবাড়ির দিকে।ওখানে দিয়ে খেলাম কুষ্টিয়ার বিখ্যাত মালাইয়েইর আইসক্রীম…হাহাহাহা…যারা চট্টগ্রামে চেরাগীপাহাড়ের মোড় থেকে ঘরে তৈরী পেস্তা বাদামের পেস্ট দিয়ে তৈরী একধরনের কুলফি আইসক্রীম খেয়েছেন তাদের কাছে স্বাদটা পরিচিত লাগবে।তবে চট্টগ্রামে খেতেন বোতলে আর এখানে পরিবেশন করা হয় কলাপাতার উপর,তালপাতার চামচ দিয়ে।মাথায় শয়তানী আসল,বললাম,এত তালপাতা আর কলাপাতার জন্য কতগাছ মেরে ফেলতেছেন,তার চেয়ে গ্লাসে দেন।হাহাহাহা…খাওয়া শেষ করে আবার পাতা আর চামচ ফেরত দিলাম,ধুয়ে আবার ব্যবহার করেন।তবে এভাবে স্বাস্থ্যকর হবে কিনা জানি না,অন্তত গাছের জান বাচবে…হাহাহাহাহা…এইসব করে ঢুকে পড়লাম রবিঠাকুরের বেডরুমে…হাহাহাহা…মোটেই জানালা দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদ দেখা যাবার কথা না,তবে দোতলার বারান্দার মত স্থানে দাড়ালে উনি কি দেখতেন জানি না,আমি দেখলাম সামনের চারটা বড় পাম্প ট্রি আর তার পরে খোলা মাঠ…কবিতা কি লেখা যায় কেবল প্রকৃতি দেখে,কি জানি…হাহাহাহা…দেখলাম বজরার ছবি,যা নিয়ে পদ্মায় ঘুরে বেড়াতেন আর লিখতেন খুব সম্ভবত…কি জানি বজরাটা পদ্মায় ভাসানো অবস্থায় দেখলে বুঝতে পারতাম…হাহাহাহা…এসব ভাবতে ভাবতে মনে হল,আমি কি রবি ঠাকুরকে বিচারের চেষ্টা করছি?নিজের সাহস দেখে ভয় পেয়ে গেলাম,তাড়াতাড়ি বের হয়ে গেলাম সেখান থেকে,তবে বের হবার আগে একটি পরিবারের ছবি তুললাম।

একদমই ধর্মভীরু পরিবার,একজন বয়স্ক ব্যাক্তি,সাথে দু’জন মহিলা যেহেতু চোখ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না, বুঝতে পারলাম না দু’জন কি ওনার স্ত্রী নাকি মা-মেয়ে…আর সাথের দু’জন নাতি কিনা তাও নিশ্চিত হতে পারলাম না।কারণ তারা কেবল ছোটাছুটি করছে।যাই হোক,হুজুরসাহেব দুই নারীর ছবি তুললেন…কেন তুললেন বুঝলাম না?কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না চোখ ছাড়া…তবুও ভাল লাগল,অন্তত এখানে তো এসেছেন,ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন সব।হাহাহা…যাই হোক ওনাদের ছবি অনুমতি ছাড়াই নিয়েছিলাম বলে এখানে দিলাম না,থাক আমার কাছে,আমিই দেখি…হাহাহাহা…

বের হয়ে এলাম।আর বের হয়ে প্রচন্ড ঝাল দিয়ে খেলাম আমড়া ভর্তা…ঝালে পাগল হয়ে আরেকটা বিখ্যাত আইসক্রিম খেয়ে,বাইকে উঠে পড়লাম।ফিরে এলাম কুষ্টিয়া সন্ধ্যার একটু পরেই।এসেই রুমে গিয়ে শীতবস্ত্র পরে নিলাম,ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে নিলাম রুম ছেড়ে দিলাম।বের হয়ে খেয়ে নিলাম,এবার সেই বিখ্যাত নান আর বিফ…দোস্ত খিচুড়ী খেল…তারপর আবার রসমালাই…হাহাহাহা…

চা খেয়ে শেষ করে যখন বাইক ছাড়লাম তখন কয়টা বাজে ঠিক স্মরণ নেই,তবে অন্ধকার হয়ে গেছে চারদিক।যদিও আমাদের প্ল্যান ছিল না রাতে বাইক চালানোর তবে শীতে যখন প্রথমদিনই রাতে চালাতেই হয়েছে তাই আর ভয় না পেয়েই সময় বাচালাম,ইতিমধ্যে অর্ধদিন পিছিয়ে গেছি আমরা পরিকল্পণা থেকে।হাহাহা…ঠিক মনে পড়ছে না কোথায় ভুল করেছি তবে নাটোরে যাবো ইচ্ছা ছিল কাচা গোল্লা খাবার জন্য আর ২০ কিঃমিঃ উলটা দিকে চলে গিয়েছিলাম,পরে আবার এক চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করে ফিরে আসলাম সঠিক পথে।তবে যখন নাটোর পৌছলাম তখন বাজে ৮টা ১৫মিনিট…হাহাহাহা…

পথের অবস্থা খুবই ভাল,তেমন কোন ভাঙ্গা চোরা নেই বললেই চলে।এবার খুজছি “জয়কালী মিষ্টান্নভান্ডার”।কোথাও ওয়াজ হচ্ছিল,ফলে মানুষ কমছিল রাস্তায়।আমরা একে ওকে এবং পুলিশকে জিজ্ঞেস করে পৌছে গেলাম জয়কালী মিষ্টান্ন ভান্ডার।আশাহত হলাম বিখ্যাত কাচাগোল্লা দেখে।অবিকল সুজির মত করে একটা বড় গামলাতে রাখা কাচাগোল্লা,কোন শেইপে না…মনে হল যেন সুজি…হাহাহাহা…খেলাম,তেমন স্বাদের মনে হল না।এর চেয়ে আমাদের কাচাগোল্লা ফার বেটার মনে হল।তবে ওটা হয়ত খাটি বলেই এমন মনে হল,কি জানি।হাজার হোক বাঙ্গালী তো,হাহাহা…সাথে গরম চমচম খেলাম।এসব খেয়ে বাইকে উঠে পড়লাম,ইচ্ছা আছে যতদূর যাওয়া যায় চলে যাব।

ঠিক কখন আমরা বগুড়া পৌছেছিলাম মনে নেই,তবে খুব সম্ভবত ১০টা বা সাড়ে ১০টার দিকে…প্রথম কথা,খেতে হবে।ক্ষুধা লাগছে…কোনকথা ছাড়াই একটা হোটেলের সামনে দাড়ালাম,আর নেমে হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসে গেলাম।সহজ হিসাব,ভাত আর কালাভুনা…দুই বন্ধু ধুমায়ে খাইলাম,সাথে কি এক মাছের ভর্তা খাইলাম…যাই হোক,মাছের ভর্তা পয়েন্টলেস।খাওয়া শেষ করলাম,চা-বিরি খাইলাম।খেয়ে বের হয়ে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।বাইক বের করার জায়গা নাই।সব ট্রাক এসে ভরে গেছে।যাই হোক,এক ড্রাইভার ভাইকে ভদ্র ভাষায় দুটা কথা বলতেই উনি ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে জায়গা করে দিলেন,আর আমরাও বের হলাম।হাহাহাহা…সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না আমরা কি এখানেই আজকের মত খান্ত দিব নাকি সামনে ছুটব।দোস্তকে এত করে এই মাথা সেই মাথা ১৪মাথার কথা বললাম,তারপরো তার মাথায় ঢুকাইতে পারলাম না,এখানেই থাকি।হালায় খালি সামনে দৌড়াইতে চায়।যাহ শালা,মেজাজই খারাপ হয়ে গেল।চল দেখি কতদূর যাইতে পারছ।

রাতের তখন ১১টা ১৫মিনিট আবার বাইক চলছে।বগুড়া থেকে বের হলাম আর রাস্তা দিয়া বাইক ৩০ এ চালাচ্ছি,কারণ রাস্তা দেখছি না তেমন কিছুই আর রাস্তা এতই ভাঙ্গা যে বলার মত না,কি হইল এখানে দিয়া কিছুই বুঝলাম না।দেখে মনে হল ইচ্ছা করেই সব কোদাল দিয়া কোপায়ে কোপায়ে গর্ত করে রাখছে।কিছু দূর গিয়ে দেখি রাস্তার কাজ চলছে আর এত অন্ধকার রাস্তা আগে কোথাও দেখি নাই।যেন আসেপাশে কিছুই নাই যদিও দাঁড়িয়ে দেখার মত ইচ্ছা ছিল না।একেতো মেজাজ খারাপ,তার উপর রাস্তা এতই খারাপ যে মেজাজ আরো চড়ে যাচ্ছে।আর পেছনে বসে আমার দোস্ত সমানে তসবিহ জপতেছে, “এই আস্তে…বেশি জোরে চালইস না”।তাও চান্স পাইলেই আমি তো দে দৌড়,সেদিনই প্রচুর বাসের চাপা খাইছি।এত রাতেও বাস পারে তো আমাদের রাস্তা থেকা নামাইয়া দেয়।দোস্ত পিছনে বইসা হালাদের গাইল্লায় আবার আমারে বলে, “তুই কিন্তু আস্তে চালা।হালাগোর বউয়েরা ফোন দিতাছে,দেখস না”।

হাসুম না কান্দুম…কিসের ভিতর কি।বউ আইলো কোথা থিকা।গাছের দিকে তাকাইয়া দেখলাম কোন পেঁচি দেখা যায় কিনা…হাহাহাহাহা…কালকে দেখতে পারুম কিনা কে জানে,রাস্তার যেই অবস্থা!!!

ঘড়িতে তখন ১টা বা শোয়া ১টা।এক সালাদিয়াঢাকা হোটেলের সামনে দাড়ালাম।চা দিতে বলে চূলার পাশে গিয়া দাড়ালাম।আমাদের দশা দেখে দোকানী আগুন একটু বাড়িয়ে দিলেন,নিজে সরে জায়গা করে দিলেন দাড়ানোর।আমি আগুন পোহাচ্ছি,দেখি আমার দোস্ত নাই।আরে হালা গেল কই,খুজতে খুজতে দেখি অন্ধকার থেকে বের হচ্ছে, “কিরে”? প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিলেন তিনি,আমিও সুযোগে দাঁড়িয়ে গেলাম। কোথায় দাড়ালাম জানি না,তবে প্যান্ট খুলতে খুলতে হয়রান হয়ে গেলাম,তারপর আবার আন্ডি…তবে পরে গাড়ির লাইটের আলোতে দেখলাম সামনেই একটা দোকান।না দেখার ভান করে কাজ সেরে এলাম।চা খেতে খেতে দোকানী ভদ্রলোকের সাথে কথা হল বললেন যে সামনের রাস্তায় তেমন কোন সমস্যা নাই।আমরা বিপদজনক রাস্তা পার হয়ে এসেছি।শুনে স্বস্তি পেলাম,তবে অস্বস্তিও লাগল এই ভেবে যে,আগে জানলে তো আসতামই না এত রাতে অই রাস্তা দিয়া…হাহাহাহা…দোস্তর দিকে একবার তাকাইলাম কেবল, সাথে সাথে বলে উঠল, “ভুল হইয়া গেছে রে,ভুল হইতেই পারে”।হাহাহাহা…এবার চল।

রাতের আড়াইটা, গোবিন্দগঞ্জ। চায়ের দোকান।

সবাই এরপর যেতে মানা করছেন।রাস্তায় ডাকাতি হবার চান্স হাই।সবাই এখানে থেকে ভোরে যাত্রা করতে বলছেন ফুলবাড়ির উদ্দেশ্যে।কি আর করা,খুঁজে ফিরে কোন হোটেলই পেলাম না থাকার মত,পরে গিয়ে এক মোটেলে উঠলাম।কোন স্টার দেবার উপায় নাই।কেবল রাত্রি যাপন করতে হবে বলেই আপনি উঠতে পারেন এমন মোটেলে।কাপড় চোপড় পরেই বিছানায় পিঠ লাগালাম আর সেভাবেই ঘুমিয়ে গেলাম… zzzZZZZ…স্বপ্নেও পেঁচিরে পেলাম না…হাহাহাহা…

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s