খৈ-এর ছড়াছড়ি-খৈয়াছড়া

হঠাৎ করেই সবাই মিলে কোথাও যাওয়ার তাড়নাতেই খৈয়াছড়ায় যাবার প্রস্তাব উঠল এবং শুনে অনেকেই আগ্রহী হয়ে গেল। ২/৩ দিনের মাঝেই সকল প্রিপারেশান নেয়া সারা যথারীতি যা হয় আমাদের…হাহাহা…

শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। মিররসরাইয়ের আগেই, চট্টগ্রাম থেকে ১ বা দেড় ঘন্টার রাস্তা। ঠিক হলো সবাই সকালে বাসে করে চলে যাবো কারণ ওখানে গিয়ে হাইকিং করতে হবে বেশ অনেকটা পথ কিন্তু আমি তো বাইক ছাড়া যামু না।হাহাহা…তাই সকাল ৭টার দিকে সবাই যখন বাসস্ট্যান্ডের পথে আমি তখন হাওয়া খেয়ে খেয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটছি।

পথে পথে এটা সেটার ছবি তুলছি, হাতে সময় আছে তাই কোন টেনশান নাই। আর যথারীতি রাস্তা ভুল করলাম, রাস্তা ফেলে ২ কিঃমিঃ পার হয়ে গেলাম পরে মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে নিয়ে সঠিক পথের দেখা পেলাম।মেইন রাস্তা থেকে যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি তা পিচঢালা না।ইটের রাস্তা…কিছুদূর যাবার পর সেটাও হারিয়ে গেল এখন পুরোই মাটির রাস্তা তবে বালু না বলে কোণ সমস্যা হচ্ছিল না।এভাবে ১/দেড় কিঃমিঃ যাবার পর কয়েকটি দোকানের দেখা পেলাম এবং সামনেই রেলক্রসিং। দোকানের সবার বডিল্যাঙ্গগুয়েজ দেখে বুঝলাম এখানে এসব দেখে এরা অভ্যস্ত। তাই নির্দ্বিধায় মোটরসাইকেল রাখার নিরাপদ জায়গা আছে কিনা জিজ্ঞেস করতেই একটা জায়গা দেখিয়ে দিলেন আর আমিও পার্ক করে ব্যাগ থেকে কাভার বের করে ঢেকে ফেললাম।

ইতিমধ্যেই বাকি সব এসে হাজির।আমিও সবার সাথে কাপড় চ্যাঞ্জ করে হাইকিং করার জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম।এর সাথে হালকা নাস্তা সেরে নিলাম।যখন সবাই হাটা শুরু করলাম তখন ঘড়িতে প্রায় ১০টা বাজে। আর কেবল আমরাই সেদিনের শরনার্থি নই, আরো অনেক দলই ইতিমধ্যে এসে হাজির।

সবাই হৈচৈ করে হাটছি আর সাথে সাথে ছবি ওঠানো তো চলছেই।মেঠো পথ, পাহাড়ি পথ, কাদা,ঝিরি পার হয়ে খৈয়াছড়ার প্রথম ধাপের সামনে এসে হাজির হতে সময় লাগল প্রায় দেড় ঘন্টার মত, কিছু কম বেশি হতে পারে কারণ এখন ঠিক মনে পড়ছে না।

কিছুক্ষণ সেখানে বসে আবার হাটা দিলাম।হাটা বললে ভুল হবে পাহাড় বাওয়া শুরু করলাম। খাড়া পাহাড় উঠে গেছে,তার উপর ভেজা কাপড়ে অনেকে হাটার কারণে পুরোই কাদা কাদা হয়ে আছে ঢাল,খুবই বিপদজনক হয়ে গেল চোখের পলকেই।তবে ভাগ্য ভাল গাছপালার শেকড়, ডাল সহায়ক ভূমিকা রাখল।প্রায় ২০/৩০ফুট উঠতে মোটামুটি হিমশিম খেলাম,ভাবতেই পারিনি এতটা স্ট্যামিনা কমে গেছে।হাহাহা…20140731_111651

তবে দ্বিতীয় ধাপ দেখে সব ভুলে গেলাম। কিন্তু খুব বেশি সময় কাটাবার কথা ভাবলাম না এখানে কারণ আমাদের শেষ ধাপ পর্যন্ত যাওয়ার খেয়াল। এভাবে একের পর এক ধাপ পার হলাম। তবে এখন পাহাড়া বাওয়া থেকেও পানি দিয়ে বেশি হাটতে হচ্ছে আর শেওলা জমা পাথরে আছাড় খাবার ভয়ে তটস্থ হয়ে আছি সবাই। কিন্তু সবাই মিলে ধরাধরি করে ঠিকই পার হলাম বিনা বিপদে। পথে পথে ভীষণ কিছু সুন্দর জায়গার দেখা পেলাম।20140731_115422

পাহাড়ের ঢাল বেয়ে,পাথুরে পথ পাড়ি দিয়ে,জলকাদা ডিঙ্গিয়ে যেখানে এলাম এটাই প্রথম ধাপ,অনেক উপর থেকে পানি পড়ছে (প্রায় ৩০ ফুট হবে)…ওখানে দাড়াবার মত জায়গা আছে কিন্তু আশে পাশে কোণদিক দিয়েই ওঠার কোন রাস্তা দেখা যাচ্ছে না।মাথায় খো চেপে গেল , “উঠবোই, উপরে”।

ব্যাস, কিছুদূর ব্যাক ট্র্যাক করে এসে একটা পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে ওঠা শুরু করলাম।পিওরলি এডভ্যাঞ্চার…হাহাহা…কোন রাস্তা নাই সামনে,রাস্তা তৈরী করে উঠতে হচ্ছে।ঝোপ জঙ্গল ধরে টেনে হিচড়ে নিজেদের একসময় পাহাড়ের চূড়াতে ওঠালাম। উঠে দেখি বাহ কি সুন্দর মেঠো রাস্তা।এবার রাস্তা দিয়ে হেটে চললাম আমাদের গন্তব্যের দিকে। রাস্তার দিক দেখে মনে হলো আমরা আমাদের গন্তব্য থেকে সরে যাচ্ছি তাই ঝর্ণাটা কোণ দিকে ঠিক করে সরল রেখা টেনে আবার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামা শুরু করলাম।

এই ঢালে বাঁশের ঝাড়,তাই খুব সাবধানেই নামতে হচ্ছে। একবার পিছলে গেলে থামা কষ্ট হবে যদি এর আগে পশ্চাৎদেশ দিয়ে কাটা বাঁশের মাথা প্রবেশ না করে।হাহাহা…ওহ বলতে মনে নাই,জোঁকে ভরা পুরা পাহাড়ি পথ।কতক্ষণ পর পরই চেক করে ক্লীন করতে হচ্ছে। যাই হোক, নামতে নামতে একটি ঝিরিতে পৌছলাম,সরু এবং ২ মিঃমিঃ এর মত পানি আছে তবে ফ্লো আছে বোঝা যাচ্ছে। ধরে নিলাম,হয়ত ঝর্ণার সোর্সের কোণ অংশ তাই অনুসরণ করা শুরু করলাম। এখান পাহাড় নয়, ঝিরি অনুসরণ করে চলছি।

কিছুদূর আসতেই ঝমঝম শব্দ শুনে ভাবলাম এসে গেছে,কিন্তু শব্দ হলেও আমাদের সামনে যেটা সেটা ১০ ফুটের একটা ড্রপ তবে শব্দ যেটা পাচ্ছি সেটা প্রথম ধাপ থেকেই আসছিল।তাই আরো জোশ বেড়ে গেল,পিছলা পাথর আর ঝোপ ঝাড় বেয়ে ১০ ফুট নেমে গেলাম। আরো কিছুদূর এগোতেই ছোট আরেকটা ড্রপ তার সামনেই আরো দুটি চ্যানেল এসে মিলিত হয়েছে। কিছুদূর এগোতেই যা দেখলাম তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না কারো।

দুই পাহাড়ের মাঝ খানে প্রায় ২৫ফুট ড্রপ,পানি পড়ছে। পাহাড়ের গায়ে ঝুলছে বাদুড় আর বাদুড়।নামার কোণ উপায় দেখলাম না। এই ড্রপের পরেই পানি ডান দিকে ঘুরে গেছে বলে দেখতে পাচ্ছি না। এবার আর সাহস করতে পারলাম না নামার। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে,হাতে পায়ের জোঁক পরিষ্কার করে আবার পাহাড় বাওয়া শুরু করলাম।সবার সাথে মিলিত যখন হলাম তখনো আধার নামেনি। আমরা প্রায় .২ঘন্টা সময় ব্যায় করেছি আসা যাওয়াতে। আমরা আসতেই সবাই আস্তে আস্তে ফেরার রাস্তায় পা দিলাম।

20140731_123712

বিঃদ্রঃ- ঝর্ণার পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখুন। নাগরিক জঞ্জাল নিয়ে যদি যান তাহলে দয়া করে সাথে করে নিয়ে আসবেন প্লিজ।না হলে ১০ বছর পর হয়তো এখানে ধোলাই খালের অবস্থা হতে পারে।হাহাহা…

Khoiyachhora Jhorna (খৈয়াছড়া ঝরনা),
Boro Takia Bazar (বড় তাকিয়া বাজার),
Mirsarai (মীরসরাই), Chittagong (চট্টগ্রাম),
Bangladesh (বাংলাদেশ)

20140731_134557

পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা অভিযান

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s